কীভাবে এত ক্ষমতাধর শি জিনপিং

ডেস্ক রিপোর্ট

শি জিনপিং চীনে কয়েক দশকের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা। কমিউনিস্ট চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাওজেদংএর পর কেউই তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হননি – যা শি জিনপিং হতে যাচ্ছেন। চীনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে। আর এসব বৈঠকে যে সিদ্ধান্তগুলো হয় – তা জানানো হয় এমন এক ভাষায় যার আসল অর্থ উদ্ধার করা সহজ নয়।

 

কীভাবে এত ক্ষমতাধর শি জিনপিং

এ কারণেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টি কীভাবে কাজ করে, বা তাদের নেতা শি জিনপিংই বা কী করতে চাইছেন – এগুলো বোঝা অনেকসময়ই বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের কাজের ধারা সম্পর্কে অভিজ্ঞ যারা তারা বলেন, পার্টির ওই শুষ্ক প্রচারণার ভাষার মধ্যে এমন অনেক ইঙ্গিত থাকতে পারে যাতে নেতার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আন্দাজ করা সম্ভব। চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সবচেয়ে বড় সংবাদপত্র হচ্ছে দ্য পিপলস ডেইলি। এই দৈনিকটির পুরনো সংখ্যাগুলো খুঁজে বিবিসি এমন কিছু সাংকেতিক শব্দ চিহ্নিত করেছে – যা শি জিনপিংএর শাসনামলকে বুঝতে সহায়ক হবে।

দ্য ‘কোর’ বা প্রাণকেন্দ্র

নেতৃত্বের একটা কেন্দ্রবিন্দুর ধারণা প্রথম তুলে ধরেছিলেন মাও জেদং – গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রথম নেতা। তিনি এই “কোর” কথাটা ব্যবহার করেছিলেন ১৯৪০এর দশকে – ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি চীনে ক্ষমতাসীন হবার আগেই। সেটা ছিল এমন এক সময় যখন মাও পার্টির ভেতরে তার ক্ষমতা সংহত করার চেষ্টা করছিলেন। এজন্য তিনি দলে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালিয়ে আর বিরোধীদের উচ্ছেদ করছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টিতে সেটাই প্রথম শুদ্ধি অভিযান ছিল না, এবং তার পরেও যে হয়নি তাও নয়। কিন্তু ইতিহাসবিদরা মনে করেন – ওই সময়কালটি থেকেই মাও ‘কাল্ট’ বা তার প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং ব্যক্তিপূজার সূচনা।

শি জিনপিংকে ঘিরে এই “কোর” শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হতে দেখা যায় ২০১৬ সাল থেকে। এর পর এই শব্দটির ব্যবহার ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। শি জিনপিং ২০১২ সালে ক্ষমতাসীন হবার আগে – তার চার পূর্বসূরীর তিনজনকেই পার্টির “কোর” অভিধা দেয়া হতো। এরা ছিলেন, মাও জেদং – আধুনিক চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা, দেং শিয়াওপিং – যিনি বিশ্বের জন্য চীনের দরজা খুলে দিয়েছিলেন, আর জিয়াং জেমিন – যিনি ১৯৯০এর দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত চীনের উত্তরণে নেতৃত্ব দেন।

তিনি ঠিক একচ্ছত্র নেতা বা ‘স্ট্রংম্যান’ ছিলেন না বরং ঐকমত্য গড়ে তোলার পথ নিয়েছিলেন। দেং শিয়াওপিংএর সময়ই পার্টিতে যৌথ নেতৃত্বের নীতি প্রচলিত হয় আর হু জিনতাওএর সময় এটাই স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতিতে পরিণত হয়েছিল – অন্তত লোকে তাই ভাবতো। বিশ্লেষকরা বলেন, শি যেভাবে দ্রুতগতিতে নিজের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন – তাতে তিনি যে এক সময় নিজেকে পার্টির “কোর” হিসেবে তুলে ধরবেন এটা প্রায় অবধারিত ছিল।

‘চায়না মিডিয়া প্রজেক্ট’ সংস্থার পরিচালক ডেভিড বান্ডুরস্কি বলছেন, “শি জিনপিংএর দরকার ছিল মুখে ক্ষমতা সংহত করার কথা বলা – যা বাস্তবে ক্ষমতা সংহত করার প্রায় সমতুল্য।” তার কথায়, “চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এখন স্পষ্টতই এক ব্যক্তির নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিপূজার দিকে এগিয়ে চলেছে।” মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষক লি ইউয়ানও বলছেন, শি-র চীন পেছন দিকে হাঁটছে এবং একক নিয়ন্ত্রণের যুগ শুরু হতে যাচ্ছে।

তিনি বলছেন, এক দশক আগে যখন শি জিনপিং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হয়েছিলেন তখন দেশটির রাজনীতি, বাণিজ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের এলিটরা আশা করেছিলেন যে তিনি চীনকে আরো উন্মুক্ত, ন্যায়বিচারসম্পন্ন এবং সমৃদ্ধ করে তুলবেন। লি ইউয়ান বলছেন, কিন্তু এখন তাদের অনেকেই মনে করেন যে শি একটি একক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র গড়ে তুলেছেন।

কীভাবে শি জিনপিং এত ক্ষমতাধর হলেন?

মাওজেদংএর একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, “রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস হচ্ছে বন্দুকের নল।” গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর মাও এটা নিশ্চিত করেছিলেন যে চীনের সেনাবাহিনী বা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) নিয়ন্ত্রণ করবে পার্টি – রাষ্ট্র নয়। তা ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির নেতাই তখন হতেন কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনেরও (সিএমসি) চেয়ারম্যান। ক্ষমতায় আসার পর শি জিনপিংও সামরিক বাহিনীর ভেতরে থাকা তার বিরোধীদের উচ্ছেদ করতে কোন বিলম্ব করেননি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলো ঘটেছিল ২০১৪ ও ২০১৫ সালে, যখন সিএমসির ভাইস চেয়ারম্যান শু কাইহু এবং পিএলএর সাবেক জেনারেল গুও বক্সিওংএর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। এরা যদিও তখন অবসর নিয়েছিলেন, কিন্তু শি এই পদক্ষেপের মাধ্যমে একটা জোরালো বার্তা দিয়েছিলেন যে সামরিক অফিসারদের কেউ যদি তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বাধা দেয়, তাহলে তার পরিণাম ভালো হবে না – বলছেন পেন্টাগনের অর্থে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ফেলো জোয়েল উটনাও।

২০১৫ সালে শি সামরিক বাহিনীর কাঠামোতে পরিবর্তনে এনে চারটি হেডকোয়ার্টার ভেঙে দেন, এবং ১৫টি ছোট ছোট এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে সিএমসির পক্ষে সরাসরি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে আদেশ পাঠানো সম্ভব হলো – এবং শির প্রতি আনুগত্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি জোরদার হলো। মার্কিন থিংক ট্যাংক র‍্যান্ড কর্পোরেশনের সিনিয়র প্রতিরক্ষা গবেষক টিমোথি হীথ বলছেন, পার্টির প্রতি চীনা সামরিক বাহিনীর আনুগত্যের মানে হচ্ছে “তাদের কর্তব্য হবে পার্টি এবং বিশেষ করে শি-কে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা।”

“লাল দেশ”

এই শব্দবন্ধটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ‘লাল নদী ও পর্বতমালা’ – এবং উদ্ভব হয় ১৯৬০এর দশকে। চীনের সমাজে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সেসময়কার ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব।’ সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মাও জেদং সেসময় যে আহ্বান জানিয়েছিলেন তাতে – চীনা বিপ্লবের সাথে প্রতারণা করেছে বলে কাউকে মনে হলেই তার বিরুদ্ধে সহিংস পন্থা নেবার আভাস ছিল। সেসময় শ্লোগান ছিল “এটা নিশ্চিত করুন যেন দেশের রঙ কখনো বদলাতে না পারে” – এবং এটা ছিল কঠোর পদক্ষেপ নেবার এক মারাত্মক আহ্বান।

 

আরও দেখুন

জ্বালানি বিল অর্ধেক করছে যুক্তরাজ্য !

প্রায় ৩ কেজির ইলিশ, দাম ৫ হাজার টাকা!

বন্ধ হচ্ছে করোনা টিকার প্রথম ডোজ

তবে মাওএর মৃত্যুর পর চীন অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ নিলে এই প্রবণতা ঝিমিয়ে পড়েছিল। বিশ্বের জন্য চীনের দরজা খুলে যাবার পর মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে পার্টির ভুমিকা অনেক পেছনে চলে গিয়েছিল, এবং এই ‘লাল’ দেশের কথা প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শি ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে । উনিশশ আশির দশক থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত পিপলস ডেইলির পাতায় লাল দেশের উল্লেখ পাওয়া যায় ২০-টিরও কম। কিন্তু এখন কথাটা আবার ফিরে এসেছে। শুধু গত বছরই এর উল্লেখ করা হয়েছে ৭২ বার।

“এই শব্দটার পুনরুত্থান দেখে বোঝা যায় শি জিনপিং চান যে চীনা রাজনীতি ও সমাজে কমিউনিস্ট পার্টিকেই হতে হবে কেন্দ্রীয় শক্তি” – বলছিলেন নিল টমাস, ইউরেশিয়া গ্রুপের একজন সিনিয়র চীন বিশ্লেষক। শি অনেকবার তার দেশের মানুষের প্রতি “তাদের হৃদয় ও রক্তে লাল জিনকে সঞ্চালিত করার” আহ্বান জানিয়েছেন – যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে “লাল দেশকে কায়েম রাখা যায়।”

চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এখন মানুষের জীবনের প্রতি স্তরে ফিরে এসেছে, এবং তা যে শুধু “লাল দেশ” শব্দবন্ধটি দিয়েই বোঝা যাচ্ছে তা নয়। চীনে তালিকাভুক্ত প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে এখন তাদের প্রতিষ্ঠানে কমিউনিস্ট পার্টির শাখা খুলতে হয়। পার্টির শতবার্ষিকীর সময় এমনকি বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও পার্টির ইতিহাসভিত্তিক কুইজে অংশ নিয়েছিলেন। সিনেমাতেও এখন দেশপ্রেমমূলক চলচ্চিত্রগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে।

“শি জিনপিং এমন একজন ব্যক্তি যার পার্টির মিশন এবং চীনের পুনরুজ্জীবনে তার ভূমিকার ওপর প্রকৃত বিশ্বাস রয়েছে ” – বলছেন নিল টমাস। তিনি বলছেন, এই মিশনের অংশ হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে চীনকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করা, এবং শি একে একটি ঐতিহাসিকভাবে উজ্জ্বল অবস্থান বলেই মনে করেন।

সূত্র: বিবিসি।

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published.